ড্যামের পুরনো নকশা।
চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
অভিজ্ঞতা অর্জনে চীনে যান প্রকল্প পরিচালক (পিডি)। কিন্তু কাজে আসেনি সে অভিজ্ঞতা। নকশার ত্রুটিতে হোঁচট খেল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেশের প্রথম মাল্টিপল হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম প্রকল্প। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা ফিজিবিলিটি স্টাডিতেও ধরা পড়ে গলদ। তাই প্রকল্পের নির্ধারিত তিন বছরের মেয়াদ শেষ হলেও ড্যাম নির্মাণের কাজই শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ড্যামের নতুন নকশা তৈরি করছে পাউবো। নকশায় ত্রুটি ও জটিলতা ছাড়াও চীন থেকে এলসি করে হাইড্রোলিক ড্যাম আমদানি করার সক্ষমতা নেই কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। বাধ্য হয়ে তৃতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে চীন থেকে ড্যামের কাঠামো আমদানির চেষ্টা করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামান ব্রাদার্স।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার শ্রীমাই নদীতে মাল্টিপল হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যামকে একটি ‘আইকনিক’ প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় পাউবো। যাচাই-বাছাই শেষে ২০২১ সালের ৪ মে প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ থাকলেও এ সময়ে মাত্র ১৭ ভাগ কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ড্যাম নির্মাণ প্যাকেজের মধ্যে চার হাজার ৪০০ মিটার নদীতীর রক্ষা কাজের মধ্যে ভৌত কাজ শেষ হয়েছে ৪২ শতাংশ। বিপরীতে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৩৭ শতাংশ তথা ৪৯ কোটি টাকা। নকশায় ত্রুটির কারণে ঝুলে যায় প্রকল্পটি। এ সংকট নিরসনে গত নভেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এখন পাউবোর ডিজাইন বিভাগ নতুন করে নকশা তৈরি করছে। এটি চূড়ান্ত হলে কাজ শুরু হবে।

পাউবো চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক খ ম জুলফিকার তারেক বলেন, নতুন ডিজাইনের খসড়া হাতে পেয়েছি। আগামী সপ্তাহ থেকে আমরা নির্মাণকাজ শুরু করতে পারব।
নকশার ত্রুটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বোরিং করে দুই বছর আগে নকশা তৈরি করেছিল। এখন চীনের প্রকৌশলীরা কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে নকশা পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। তাই টেকসই ড্যাম করতে নতুন নকশা করতে হচ্ছে। নতুন নকশার খসড়া গত বৃহস্পতিবার হাতে পেয়েছি।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, যখন ড্যাম নির্মাণকাজ শুরু করি, নকশা অনুযায়ী মাটির প্রকৃতিগত ত্রুটির কারণে পাইলিং করা যাচ্ছিল না। তাই নতুন করে নকশার প্রয়োজন পড়ে। আশা করছি, কিছু দিনের মধ্যে পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারব।
নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, প্রকল্পের ভৌত অবকাঠামোগত অনেক কাজ শেষ হয়েছে। সে অনুযায়ী ঠিকাদারকে বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। তবে চীন থেকে ড্যাম আনতে একসঙ্গে অনেক টাকা প্রয়োজন। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএবি-আবুল কালাম জেভি তাদের পার্টনার জামান ব্রাদার্সের মো. মনির আরেকটি ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে এলসি করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামান ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মো. মনির বলেন, পাইলিং ঝামেলা ও ড্যামের নকশার কারণে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। আমার বিদেশ থেকে এলসি করে পণ্য আনার অভিজ্ঞতা নেই। তাই চীনের সঙ্গে কাজ করে ‘বাংলা মার্ক’ নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি। লভ্যাংশের ভিত্তিতে তারা এলসি করে চীন থেকে ড্যাম আনবে। এলসি করতে একসঙ্গে ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকা লাগে। এত টাকা না থাকার কথা স্বীকার করেন মনির।

উন্নত প্রযুক্তির এই ড্যাম সম্পূর্ণ রিমোট কন্ট্রোল প্রযুক্তিতে পরিচালিত হবে। ড্যামের গেট খোলা ও বন্ধের কাজ হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ডিজিটাল মনিটরের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। হাইড্রোলিক সিলিন্ডার, হাইড্রোলিক পাম্প স্টেশন, ম্যানেজমেন্ট স্টেশন, পিএলসি কন্ট্রোল স্টেশনের পাশাপাশি আপস্ট্রিম পদ্ধতির ব্যবহার থাকবে এ মাল্টিপল ড্যামে।
শ্রীমাই খালে ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের বহুমুখী হাইড্রোলিক ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষার পানির বড় পরিমাণ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সংরক্ষিত পানি শুষ্ক মৌসুমে এক হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডিতে বলা হয়েছে, ড্যাম নির্মাণের ফলে কৃষি ছাড়াও মৎস্য, যোগাযোগ ও ইকো-ট্যুরিজম খাতের অর্থনীতি উন্নত হবে।
শ্রীমাই পাড়ের কৃষক নাজমুল আলম বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা বলছেন, ড্যামের ফলে কয়েক হাজার একর জমি শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদের উপযোগী হবে। কিন্তু নদীর পাড়ে কিছু ব্লক বসালেও প্রকৃত নির্মাণের কোনো খবর নেই। আমাদের স্বপ্ন আজও বাস্তবে পরিণত হয়নি।
Leave a Reply